পুড়ছে পৃথিবীর ‘ফুসফুস’… প্রতি মিনিটে ভস্ম দুটি ফুটবল মাঠের সমান এলাকা!

পুড়ছে পৃথিবীর ‘ফুসফুস’… প্রতি মিনিটে ভস্ম দুটি ফুটবল মাঠের সমান এলাকা!

অনলাইন ডেস্ক> ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে পৃথিবীর ‘ফুসফুস’খ্যাত বিশ্বের সর্ববৃহৎ বনাঞ্চল আমাজন। এককভাবে সবচেয়ে বড় এই রেইন ফরেস্টে (ঘনবর্ষণ বনভূমি) চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৭৫ হাজার বার আগুন লেগেছে। শুক্রবার (২৩ আগস্ট) পর্যন্ত বনের দুই হাজার ৫০০টি এলাকা আগুনে পুড়েছে। প্রতি মিনিটে ভস্ম হচ্ছে দুটি ফুটবল মাঠের সমান এলাকা। এর পাশাপাশি বনখেকোদের দৌরাত্ম্য তো আছেই। কৃষি ও শিল্পের জন্যও উজাড় করা হচ্ছে বন। তাই পরিবেশ বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এখনই বন ধ্বংস ঠেকানো না গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বনাঞ্চলটি হয়তো বিলীন হয়ে যাবে। আমাজন নদী অববাহিকায় নয়টি দেশের ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটারে বিস্তৃত এ বনাঞ্চল থেকে পৃথিবীর ২০ শতাংশ অক্সিজেন উৎপাদিত হয়। এ কারণে একে পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয়। এ ছাড়া সেখানে প্রায় ১৬ হাজার প্রজাতির ৩৯ হাজার কোটি বৃক্ষ, ৪৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড়, ৪২৮ প্রজাতির উভচর, ৩৭৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও তিন হাজার প্রজাতির মাছ ও জলজপ্রাণী রয়েছে। পৃথিবীর আর কোনো বনে এত বেশি প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য নেই। সুনিবিড় এই বনভূমিতে এখনও এমন সব উদ্ভিদ আর প্রাণীর প্রজাতি আছে, যা রয়ে গেছে মানুষের জানাশোনার বাইরে। গবেষকরা প্রতিনিয়তই নতুন কোনো জীব খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
আমাজনের নিয়ন্ত্রণহীন দাবানলকে আন্তর্জাতিক সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোন। ফুটবল তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো থেকে হলিউড সুপারস্টার লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, সঙ্গীতশিল্পী ম্যাডোনাসহ অনেক তারকা ও পরিবেশবিদ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে এ উদ্বেগে কান না দিয়ে উল্টো পরিবেশবাদী এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে আমাজনে আগুন লাগানোর অভিযোগ তুলেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জায়ার বোলসোনারো।

দাবানলে পুড়ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বনাঞ্চল আমাজন- সংগৃহীত

আমাজন অরণ্যের ৬০ শতাংশ পড়েছে ব্রাজিলে। যেখানে এখনও ১৯৬৫ সালের আইন প্রচলিত। এর অধীনে ভূমির মালিকেরা তাদের জমির কিছু অংশে বনায়ন করতে বাধ্য। আমাজনের ১৩ শতাংশ পেরুতে এবং বাকি অংশ রয়েছে কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, গায়ানা, সুরিনাম এবং ফরাসি গায়ানায়। পৃথিবীর মোট রেইন ফরেস্টের অর্ধেকটাই এই অরণ্য নিজেই। শুস্ক মৌসুমে আমাজনে দাবনল স্বাভাবিক ঘটনা হলেও চলতি বছরে যেভাবে আমাজন পুড়ছে, তা পৃথিবীর জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। বর্তমানে ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য রোরাইমা, অ্যাক্রি, রোনডোনিয়া ও আমাজোনাসের হাজার হাজার হেক্টর আগুনে পুড়ছে। আর সেই দাবনলের ধোঁয়া প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার উড়ে সাওপাওলোর মতো ব্রাজিলের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর আকাশও আচ্ছন্ন করে রাখছে। এখনই দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে তা ব্রাজিলীয়দের জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। একই সঙ্গে আমাজনে বসবাসকারী তিন শতাধিক আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনও বিপন্ন হবে।
প্রায় সাড়ে ১১ হাজার বছর আগে আমাজনে মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে সেখানে দুই লাখের মতো আদিবাসী ও উপজাতি রয়েছে। তাদের জীবন-জীবিকাও জঙ্গল ঘিরে। তবে বন উজাড় হওয়ায় এবং জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় খাদ্য সংকটে তাদের সংখ্যা দিন দিন কমছে। আমাজনে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী জিনগু। এ ছাড়া আমাহুয়াকা, হুয়াওরানি, কোগি ইন্ডিয়ানসসহ তিন শতাধিক সম্প্রদায় রয়েছে।
আমাজন বিনাশে বৈধ-অবৈধ খনি বাণিজ্যেরও বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। নয়টি দেশে বিস্তৃত আমাজনের ২৪৫টি এলাকায় দুই হাজার ৩১২টি অবৈধ খনি রয়েছে বলে জানিয়েছে আমাজন সোশিও-এনভায়রনমেন্টাল। ক্লার্ক ইউনিভার্সিটির গবেষণায় বলা হয়েছে, খনি ও তেল, গ্যাস উত্তোলনে ঝুঁকিতে রয়েছে আমাজন। এ ছাড়া আগামী দুই দশকে এখানে বড় ধরনের অবকাঠামোগত প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হবে। ক্লার্ক ইউনিভার্সিটির পিএইচডি প্রার্থী লরা সোলস বলেন, বৈধ খনি ও সংশ্নিষ্ট অবকাঠামোগত প্রকল্প বনাঞ্চলের জন্য হুমকি। আর জলবায়ু পরিবর্তনে আমাজনের বন বিনাশের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করা পরিবেশবিদ আদ্রিয়ান মুয়েলবার্ট বলেছেন, অতীতে দাবানল বৃষ্টিহীনতার সঙ্গে জড়িত ছিল। কিন্তু এই বছর আর্দ্রতা যথেষ্ট রয়েছে। এর কারণে মনে করছি এই আগুন অরণ্য বিনাশের জন্যই।
বুধবার ব্রাজিলের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইনপে) স্যাটেলাইট উপাত্ত বিশ্নেষণ করে জানায়, গত বছরের প্রথম আট মাসের তুলনায় এ বছর আমাজনে ৮৫ শতাংশ বেশি বার আগুন লেগেছে। সাধারণত জুলাই-অক্টোবর গ্রীষ্ফ্মকালীন মৌসুমে আমাজনে দাবানল হয়। বজ্রপাত ও গাছের ডালে ডালে ঘর্ষণ থেকে প্রাকৃতিক দাবানলের সূত্রপাত। তবে এখন বনাঞ্চলে কৃষি, পশুচারণ ও শিল্পের প্রসারের জন্য আগুন লাগিয়ে বন উজাড়ের মতো অহরহ ঘটনা ঘটছে। ইনপের তথ্য অনুয়ায়ী, ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত এ দুই কারণে আমাজনে ৪০ হাজার বার আগুন লেগেছে, যেখানে ২০১৯ সালে একই সময়ে এ সংখ্যা ৭৫ হাজার বার এবং ২০১৭ সালে ছিল প্রায় ৫৫ হাজার বার, ২০১৬ সালে ছিল প্রায় ৭০ হাজার বার। ইমপের সর্বশেষ পরিসংখ্যান আরও বলছে, ২০১৮ সালে সব মিলিয়ে সাত হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার বনাঞ্চল হারিয়ে গেছে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি। ২০১৯ সালের আপাত পরিসংখ্যান থেকে ধারণা করা হচ্ছে, আমাজন বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার এই হার প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো গত জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর তিনগুণ হয়েছে। শুধু গত মাসেই ২২০০ বর্গকিলোমিটার বনাঞ্চল খালি করা হয়েছে, যা গত বছরের জুলাই মাসের তুলনায় ২৮০ শতাংশ হারে বেশি।
পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, মুনাফামুখী ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোর পরিবেশবিরুদ্ধ কথাবার্তা বন উজাড়ের কর্মকাণ্ড উস্কে দিচ্ছে। এ অভিযোগের বিরুদ্ধে স্থানীয় সময় বুধবার ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে বোলসোনারো দাবি করেছেন, যেসব বেসরকারি সংগঠনের (এনজিও) তহবিল বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে আমাজনে আগুন দিচ্ছে। তবে এ কথার সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি।
পরিবেশবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মোঙ্গাবের তথ্যমতে, আমাজন জঙ্গল প্রতি বছর ২০০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। আর পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের ২০ শতাংশ উৎপাদন করে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার হার কমাতে এই বনভূমির বিশাল ভূমিকা রয়েছে। এ বিষয়ে আলোকপাত করে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে এক টুইটে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাক্রোন বলেন, আমাজন রেইন ফরেস্ট আমাদের গ্রহের ২০ শতাংশ অক্সিজেন সরবরাহ করে- তাতে আগুন জ্বলছে। জরুরি ভিত্তিতে জি-৭ সম্মেলনের প্রথম দুই দিনে সদস্যদের এ বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। ফ্রান্সের বিয়ারিৎজ শহরে আজ শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে শিল্পোন্নত সাত দেশ- কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত জি-৭-এর সম্মেলন। তবে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো ফরাসি প্রেসিডেন্টকে ‘চটকবাজ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, আমাজন দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়কে হাতিয়ার করে মাক্রোন বৈশ্বিক রাজনীতির ফায়দা তুলতে চাইছেন। আমাজন অববাহিকার দেশগুলো ছাড়া জি-৭ সম্মেলনে এ ইস্যুতে আলোচনা আহ্বান করা ঔপনিবেশিক মানসিকতা ছাড়া কিছুই নয়।
অন্যদিকে আমাজনের আগুনের ছবি ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী ম্যাডোনা বলেছেন, প্রেসিডেন্ট বোলসানারো দয়া করে আপনার নীতি বদলান এবং শুধু আপনার দেশকেই নয়, পুরো বিশ্বকে সহযোগিতা করুন। এ ছাড়া হলিউডের সুপারস্টার লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও তার ভক্তদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমাজন গ্রুপকে অনুদান দিন এবং নির্বাচন এলে এমন নেতাকে ভোট দিন, যিনি জলবায়ু সংকট বোঝেন।’ আমাজন গ্রুপস জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কাজ করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস অ্যাটমোসফিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের (ক্যামস) বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, আমাজনে আগুন লাগলে তা দুই-তিন হাজারেরও বেশি কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আটলান্টিক উপকূলের দেশগুলোয় পৌঁছে যেতে পারে। চলতি বছরে আমাজনের আগুন থেকে ২২৮ মেগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে ব্যাপক মাত্রায় বিষাক্ত কার্বন মনোঅক্সাইডও উৎপন্ন হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল অঞ্চলে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষ এই বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। একই কারণে হুমকিতে রয়েছে ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডরসহ আমাজনের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের মানুষ। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়াচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড। ফলে আমাজন পুড়ে ছাই হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি আটকানোর প্রধান উৎসও হারাবে মানুষ। তখন এর ভয়ঙ্কর পরিণতি ভোগ করতে হবে গোটা বিশ্বের মানুষকে।